নেপালের ২০ কিলোমিটার আর বাংলাদেশি পর্যটকদের আফসোস!
পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া থেকে নেপালের কাঁকরভিটা স্থল বন্দরের দূরত্ব সাকুল্যে ২০ কিলোমিটার। মাঝখানে ভারত। এই ২০ কিলোমিটার দূরত্বই যেন বাংলাদেশী পর্যটকদের দীর্ঘ আফসোসের কারণ!
২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হলে হয় ভারতের ভিসা নিতে হয়, নাহয় আকাশপথে যেতে হয়। ভিসা নেয়া কি ঝক্কিঝামেলার কাজ সেটা যে একবার করেছে সেই জানে। তারওপর সম্প্রতি ভারতের ভিসা পাওয়াও অনিশ্চিত হয়েছে। আবার আকাশপথে বিমানভাড়া জনসাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে।
এমতাবস্থায়, স্বল্প বাজেটে ভ্রমণকারীদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না!
ঘরকুনো বাঙালির রক্তেই আবার ভ্রমণের নেশা। আদিকাল থেকেই। সাজেক, কক্সবাজার বা সেইন্ট মার্টিনে উপচে পড়া দেশীয় পর্যটকদের ভীড় দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। সামান্য ফুরসত পেলেই এখানে সেখানে ঘুরে আসতে চায় এদেশের মানুষ। বাংলাদেশের জিডিপিতে অভ্যন্তরীণ পর্যটনও সেই ইঙ্গিত দেয়। চলতি বছর জিডিপির চার দশমিক ৪ শতাংশ কেবল পর্যটন খাত থেকেই এসেছে।
স্বল্প বাজেটের পর্যটকেরা সময় ও অর্থের দিক বিবেচনা করে দেশের হাতেগোনা কিছু ভ্রমণস্থানেই যান। মধ্যবিত্ত পর্যটকেরা পয়সা জমিয়ে এতোদিন ভারতে ঘুরে বেড়াতেন। খুব বেশি হলে নেপাল! এর বাহিরে যাবার সাধ্য এদেশে খুব কম মানুষেরই আছে।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বর এলেই পঞ্চগড় থেকেই দেখা মেলে হিমালয় পর্বতমালার সুন্দরী কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, কুম্ভকর্ণ ও সিনিওলচু পর্বতশৃঙ্গ। আকাশ ভালো থাকলে খালি চোখেই দার্জিলিংয়ের নিকটবর্তী কার্শিয়াং শহরটাও দেখা যায়৷ যেন হাতছানি দিয়ে ডেকে বলে আয়! কিন্তু যাবার তো উপায় নেই! মাঝখানে কাঁটাতারের সীমান্ত!
দেশভাগের ধারালো করার উপমহাদেশটাকে এমন ভাবে কেটেছে যে বাংলাদেশের ভাগে প্রায় কিছু পড়েনি- ওই সুন্দরবন, সাগর আর একটু খানি পাহাড় ছাড়া। তাইতো স্বল্প বাজেটের পর্যটকদের ভারত সীমান্তে ওপারের সুন্দর বরফ, পাহাড়, আর ঝর্ণা দেখে বুকের চাপা দীর্ঘশ্বাস উগড়ে দিতে হয়।
ফলতঃ সাধ্যের সামান্য বাহিরে গিয়ে বিদেশ ভ্রমণ বলতে বাংলাদেশিদের কাছে ভারতই প্রধান তীর্থক্ষেত্র। ভারতভূমিতে মার্কিনদের পরপরই সবচেয়ে বেশি এই বাংলাদেশিরাই বেড়াতে যায়৷ বহির্বিশ্বে ভ্রমণে বাংলাদেশিদের ওপর ভারতই একচেটিয়া ব্যবসা ধরে রেখেছে।
অথচ প্রতিবেশি আরেক দেশ নেপাল অনন্য সুন্দর। সাগর বাদে এই হিমালয়কন্যায় কী নেই যা ভারতে আছে! কাশ্মীরের মতো চমৎকার সব ভ্যালি আছে, লাদাখের মতো মাস্তাং ভ্যালি আছে, জলপাইগুড়ির মতো জঙ্গল আছে, উত্তরাখণ্ড বা সিকিমের মত বরফের পাহাড় আছে ভুড়ি ভূড়ি। ভ্রমণ ভিসা পাওয়াও অনেক সহজ!
কেবল যাতায়াতের বিষয়টা বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় সীমান্তের ২০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় দেশটিতে যেতে পারছে না আমাদের দেশের ভ্রমণপিয়াসীরা। আগে ভারত ট্রানজিট ভিসা দিতো, এখন সেটাও বন্ধ। রাউন্ড ট্রিপ করতে গেলে শুধু বিমান ভাড়াই পড়বে নিদেনপক্ষে ৫০ হাজার টাকা! এতো টাকা কই এই গরীব দেশের মানুষের কাছে?
পঞ্চগড়ে বাড়ি হওয়ায় যখনই উত্তরের কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে চোখ পড়ে, আফসোসে পুড়ে যাই! এই ২০ কিলোমিটার, মাত্র ২০ কিলোমিটার! তারপরেই এক অপার সৌন্দর্যে ভরপুর দেশ, হিমালয় কন্যা নেপাল! অথচ যেতে পারছি না।
যদ্দূর মনে পড়ে ২০১৮ সালে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর চালু হবার পরপরই এই বন্দর দিয়ে ঢাকা-কাঠমাণ্ডু বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। একটা দুটা পরীক্ষামূলক ট্রিপও হয়েছিলো বোধ হয়! কিন্তু কি এক অজানা কারণে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। যদি সেটা বাস্তবায়িত হতো, তাহলে শ্যামলী-এনআর-বিআরটিসির এসি বাসে ২০ ঘণ্টায় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিয়েই কাঠমাণ্ডুতে যেতে পারতো এই দেশের ভ্রমণবিলাসীরা!
এই বাস সার্ভিস কেন বন্ধ হলো! স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে এখানে ভারতে হাত আছে কি না! থাকতেই পারে। নেপাল যদি সহজগম্যই হতো তাহলে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটক অর্ধেকে নেমে আসতো! ভারত কি সেটা চাইবে?
বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে এখন নেপাল আমাদের বহির্বিশ্বে ভ্রমণের এক নতুন সম্ভাবনার হাক দিচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
নেপালের সরকার ও মানুষের মনেও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের প্রতি এক অন্যরকম আবেগ আছে। সালের ভূমিকম্পে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন ভোলে নি ওরা। ওদের ছেলেমেয়েরা যারা বাংলাদেশে পড়ে, তাদের মুখে বাংলাদেশের উষ্ণ আতিথিয়েতার গল্প তারা শুনেছে। এই সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতের একটা সহজ রাস্তা করা গেলে!
এই ক্ষেত্রে অনেক বিকল্প উপায় আছে!
প্রথমত, প্রতিবেশি দেশ ভারতকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। এতোদিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ট্রানজিটসহ নানা অসম সুবিধা তারা নিয়েছে। এখন বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে সেই চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা দরকার। নতুন চুক্তির সময়ে আমাদের বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের কাঁকরভিটা বন্দরের ২০ কিলোমিটার ভারতীয় রাস্তায় ট্রানজিট নেয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনে কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ দিতে হবে।
তাতে কেবল দুই দেশের পর্যটন ও যোগাযোগের উন্নতিই হবে, তা নয় অর্থনৈতিক একটা গুরুত্বও থাকবে। এটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন যে প্রচুর নেপালী বাংলাদেশে মেডিকেল, কৃষি ও প্রকৌশল বিদ্যায় পড়তে আসে। যোগাযোগ সহজ হলে আরও বেশি শিক্ষার্থী এদেশে আসবে।
এছাড়া নেপালের সাথে স্থলের যোগাযোগ ঠিক হলে বাংলাদেশের আমদানী-রফতানিতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে। পাশাপাশি এই স্থল যোগাযোগের ফলে নেপাল পণ্য আমদানিতে বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। তাতে এদেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্রজন হবে। আর ফাঁকতালে দুই দেশের পর্যটকেরা অল্প খরচায় ভ্রমণের সুবিধা পেয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, বিমান ভাড়া জনসাধারণের সাধ্যের ম্ভেতর আনা দরকার। এটা ঠিক যে উপর্যুক্ত বিকল্প উপায়টি বেশ জটিল কূটনীতিক সমীকরণ। ভারত স্বভাবতই এতো সহজে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্থল যোগাযোগ সম্পন্ন হোক, তা চাইবে না। বিকল্প হইলো দুই দেশের বিমান যোগাযোগের খরচ যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে দুই দেশের বিমান চলাচলে বন্দর ভাড়া ও শুল্ক ইত্যাদি খাতে ছাড়ের একটা সমঝোতা করা যেতে পারে। এতে করে বিমান ভাড়া অনেকটাই কমে আসবে।
তৃতীয়ত, বিমানভাড়া আরও নাগালের মধ্যে চলে আসবে যদি শুল্ক ও বন্দর ভাড়া কমানোর পাশাপাশি বিমান পথের দূরত্বও কমানো যেতে পারে। ঢাকা থেকে কাঠমাণ্ডু অনেক দূরের পথ, খরচও তাই বেশি। তার বদলে ঠাকুরগাঁও বিমান বন্দর চালু বা চলমান সৈয়দপুর বিমান বন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা যেতে পারে।
এই দুই বন্দর থেকে নেপালের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত চন্দ্রগাড়ি ও বিরাটনগর বিমান বন্দর। এই দুটোর মধ্যে চন্দ্রগাড়ি বিমানবন্দর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার। ঠাকুরগাঁও বিমান বন্দর থেকে ৫০/৬০ কিলোমিটার ও সৈয়দপুর থেকে ৭০/৮০ কিলোমিটার হবে। আর বিরাট নগর বিমান বন্দর ঠাকুরগাঁও থেকে ৭০/৮০ কিলোমিটার আর সৈয়দপুর থেকে ১২০ কিলোমিটারের মতো। অর্থাৎ মাত্র আধ ঘণ্টাতেই দুই দেশের এই চারটি বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করা যাবে। খরচও অর্ধেকে নেমে যাবে।
এখন দেখেন, যেটা ভালো মনে করেন! 😑
পঞ্চগ

ড়ের তেতুলিয়া থেকে ছবিটি তুলেছেন আলোকচিত্রী Firoz Al Sabah।
0 মন্তব্যসমূহ