চোখের বালি " শুটিংয়ে ঐশ্বর্যর ছবি তুলা নিয়ে যত কাহিনী - অশোক মজুমদার এর লেখা। পড়ে দেখুন,কথা দিলাম ভালো লাগবে। ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমা "চোখের বালি" শ্যুটিংয়ের জন্য ঐশ্বর্য রায় কলকাতায়। প্রায় আটদিন শুটিং হয়ে গেছে। একটি ছবিও কলকাতার কোন পত্রপত্রিকায় বেরোয়নি। আমরা সব কাগজের চিত্র সাংবাদিকরা লেগে আছি যদি একটা ছবি তোলা যায়। কিন্তু না!! শ্যুটিংয়ে মাছি পর্যন্ত গলতে পারবে না এমন বজ্র আঁটুনি। যদিও ওদের ভিতরে আমি গোঁফে তা দিচ্ছি। কারণ তখন ঋতুপর্ণ আনন্দলোকের সম্পাদক। অফিসের লিফটে বা আনন্দবাজারের নিচে আমার সাথে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো। তখনও শ্যুটিং শুরু হয়নি। আমি কিন্তু ....'কি গো ঐশ্বর্য রায় কলকাতায় এলে কিন্তু আমি এক্সক্লুসিভ ছবি তুলবো। আমায় ছাড়া তুমি কাউকে বলবে না। আনন্দবাজারে এ ছবি যেন এক্সক্লুসিভ হয়।"....দেখা হলেই একথা বলতাম। শ্যুটিং চলাকালীন একদিন কোনো কাজে আনন্দলোক ডিপার্টমেন্টে এসেছিল। আমি খবর পেয়ে সটান হাজির ঋতুর সামনে। বললাম, "কবে যাবো বলো। কে কোথায় ফাঁক তালে তুলে নেবে। ব্যাস হয়ে গেলো আমার।" "লক্ষী সোনা। তুই জেনে রাখ তোকেই আমি ছবি তুলতে দেব। আর কেউ পাবে না। আমায় কয়েকদিন কাজটা একটু গুছিয়ে নিতে দে।" ঋতু বহুবছর আনন্দলোকের সম্পাদক ছিলো। সেই সুবাদে আমার সাথে ওর একটা খাতির ছিল। আমায় দিয়ে মাঝেমধ্যে আনন্দলোকের জন্য কিছু কাজ করিয়ে নিত। যদিও কলকাতার পাতা ছাড়া সিনেমার নায়ক নায়িকার ছবি তুলতে ভালো লাগতো না। কিন্তু ওর কথায় আমি না করতে পারতাম না। ২০০২ এর খুব সম্ভবত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে চোখের বালির শ্যুটিং শুরু হয়েছিল। বলিউডের নম্বর ওয়ান সুন্দরী ঐশ্বর্য রায় ঋতুপর্ণর ছবিতে কাজ করছেন, তাও কলকাতায়। বুঝতেই পারছেন ফটো জার্নালিস্টদের অবস্থা!! আমি তখন কলকাতার পাতায় প্রতিদিন কিছু ভালো ছবি এক্সক্লুসিভলি তোলার চেষ্টা করছি। সেই ছবি যে সেলিব্রেটিদের হতে হবে এরকম কোন মানে নেই। এমনিই কলকাতার বিভিন্ন মুড আমি তোলার চেষ্টা করতাম। আশ্চর্য লাগে সারা বছর ধরে আনন্দবাজার পত্রিকায় নিউজের ছবি যা তুলেছি তারচেয়েও কলকাতার পাতায় তোলা ছবি দেখে মানুষ আমায় বেশি করে মনে রেখেছেন। যাইহোক যথা সময়ে ঋতুপর্ণ একদিন ফোনে বললো, "শোন কালকে দুটোর পর আরসিজিসি (রয়াল ক্যালকাটা গল্ফ ক্লাব) চলে আয়। কাউকে বলিসনা। আর শোন, সাথে কোনো রিপোর্টার যেন না থাকে। আর আমি না বলা অব্দি এসেই তুই কোন ছবি তুলবি না। জেনে রাখ বলিউডে ইউনিটের ফটোগ্রাফার ছাড়া কেউ শ্যুটিংয়ে গিয়ে ছবি তুলতে পারে না। আমি তোর সাথে আগে আলাপ করিয়ে দেবো, তারপরে ছবি তুলিস।" যথাসময়ে আমি আরসিজিসিতে হাজির হই। দেখি বুম্বা (প্রসেনজিৎ) , রাইমা, টোটা এরকম আরো অনেকে শ্যুটিং স্পটে সেজেগুজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার সাথে ব্যক্তিগত স্তরে এদের যোগাযোগ খুবই ভালো কারণ কলকাতার পাতায় আমি এদের নিয়ে মাঝে মধ্যেই ছবি তুলতাম। একটু ভিন্ন আইডিয়াতে ছবিগুলো তুলতাম বলে এরা আমায় বিশেষ মর্যাদা দিতো। গল্পগুজব এর ভেতরে আমি ঋতুপর্ণর খোঁজ করি। দেখি একটু দূরে বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান অভিকের সাথে কথা বলতে বলছে। কাছে যেতেই ঋতু চিৎকার করে.... " তুই ক্যামেরা বার করে আছিস কেন? ওটাকে আগে ব্যাগে ঢোকা। চুপ করে কোথাও বসে থাক। তোদের নিয়ে এই মুশকিল। বারবার বললাম অ্যাশ্ আসুক আলাপ করিয়ে দি। তারপর ছবি তুলিস। এরা কলকাতার বাঙালি স্টার নয়। যা ইচ্ছা করবি চেনা জানা বলে। একবার যদি দেখে আমাদের ইউনিটের অমল কুন্ডু বাদে তুই ছবি তুলছিস, তাহলেই শুটিং বন্ধ।" বেশ মজা করে বললো, "শোন ওদের মিনিটে না সেকেন্ডে সেকেন্ডে টাকা দিতে হয়।" বললাম, "ঠিক আছে ঠিক আছে। ক্যামেরা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছি। তুমি চিন্তা করোনা।" গল্ফ ক্লাবের পুকুরপাড়ে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসে সিগারেট ধরালাম। হটাৎ দেখি পুকুরের ওপারে একটা মেকআপ ভ্যান থেকে ঐশ্বর্য রায় একটা ফিনফিনে কাপড় পরে সিকিউরিটি নিয়ে শ্যুটিং স্পটে যাচ্ছে। বেশ সুন্দর লাগছে। একদম অন্যরকম। এরকম একটা ক্যানডিড শট দেখেই আমি ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে বসে বসেই তিন চারটা ছবি তুলে রাখলাম। ছবি তোলাটা কেউ দেখতে পায়নি। ডিজিটাল ক্যামেরায় দেখলাম ছবিটা বেশ লাগছে। শ্যুটিং ছাড়া অন্য রকম ছবি হলো। মনে মনে ভেবেও রাখলাম এটাই কলকাতার পাতায় দেব। ক্যামেরা ঢুকিয়ে শ্যুটিং এর দিকে হাঁটা দিলাম। দেখি বুম্বা রেডি, দূরে টোটা একটা ঘোড়ার গাড়ির সামনে ঘুরছে। রাইমা বসে আছে। দীর্ঘদিনের সাংবাদিক পরে পরিচালক বন্ধু কলিগ সুদেষ্ণা রায়ও ইউনিটে রয়েছে। ঋতুপর্ণ হঠাৎ বলল, "এই অ্যাশ্ এখনো আসছে না কেন ? ওকে তো টাইম বলা ছিল।........... উফফ!!! দেরি হয়ে যাচ্ছে। সূর্যটা পরে যাবে। ওর শটগুলো তো শেষ করতে হবে।" এটা বলতে বলতেই একজন ওর কাছে ওয়াকিটকি দিল। শুনছি সিরিয়াস মুখে ঋতু বলছে, "নেহি নেহি হামারা ইধার কোই ফটো নেহি কিয়া।" কথাটা কানে যেতেই আমি তো ভয়ে চুপ। তারপর শুনছি ঋতু ইয়েস ইয়েস করছে। ওয়াকিটকি রেখেই ঋতু সরাসরি আমাকে বললো......"অশোক তুই কি পুকুরপাড়ে অ্যাশের কোন ছবি তুলেছিস?" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "হ্যাঁ, মানে উনি আসছিলেন আমি দূর থেকে তিনটে ছবি তুলেছি।" ঋতুপর্ণ চিৎকার করে বলল, "কেন তুলেছিস ? বারবার বললাম আমি না বলা অবধি ছবি তুলবি না। অ্যাশ্ এখন শ্যুটিংয়ে আসবেনা। বলছে একটা দাড়িওয়ালা লোক পুকুরপাড় থেকে আমার ছবি তুলেছে। দিলি সব মাটি করে। এই জন্য তোদের ডাকি না। কোন নিয়ম কানুন মানিস না। সব পণ্ড করে দিলি।" ঋতু প্রায় দৌড়ে ভ্যানের দিকে চলে গেলো। শ্যুটিং স্পটে সবাই চুপ। এর ওর মুখের দিকে দেখছে। মিনিট দশেক পর ঋতু ঐশ্বর্যকে নিয়ে ফিরলো। এসে প্রথমেই আমার সাথে আলাপ করিয়ে বললো, "এ অশোক মজুমদার। ভালো ফটোগ্রাফার। আমরা একসাথেই কাজ করি। আমি ওকে আসতে বলেছি। ও ভুল করে তোর ছবি তুলে ফেলেছে। প্লীজ কিছু মনে করিস না। ওই ছবি ও সব ডিলিট করে দেবে।" এখানে একটা বলি, ঋতু সবাইকেই তুই বলে ডাকে সে যত বড়ই হোক। যাইহোক, আমি তো চুপ। ঐশ্বর্য তো পাত্তা তো দূরের কথা তাকিয়েও দেখলো না। তবু আমি দুবার সরি সরি বললাম। শ্যুটিং শুরু হলো। ঋতুর অনুমতি নিয়ে ক্যামেরা বার করলাম। আমি খুব গায়ে পরেই ( বাংলা হিন্দি মিশিয়ে ) সুযোগ পেলেই কথা বলা শুরু করলাম। এক ফাঁকে বলেও ফেললাম, "দেখিয়ে হাম কভি শুটিং কা ফোটো নেহি খিচা। ঋতু বহুত বার বোলা ভি। লেকিন গলতি সে হো গয়া। প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড। লেকিন ইয়ে ফ্রেম বহুত আচ্ছা হুয়া।".....বলে ওকে ফ্রেম টা দেখাই। ঐশ্বর্য চুপ করে থাকে। পরে এক সময় আমার কাছে এসে বললেন, "দাদা আপনে জো ফটো খিঁচতে হ্যায় ও সব হামকো দেখা লেনা।" আমি বললাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ জরুর।" এখনো মনে আছে আমি এরপরেও চারবার চোখের বালির শ্যুটিংয়ে হাজির হয়েছিলাম। ঐশ্বর্য শট দিয়ে মনিটরে দেখার পরই আমার ক্যামেরায় দেখতো স্টিলে ওকে কেমন লাগছে। একদিন ঋতু তো আওয়াজ দিয়ে বলেই ফেললো, "এবার তো মনে হচ্ছে তুই ঐশ্বর্য রায়ের পার্সোনাল ফোটোগ্রাফার হয়ে যাবি।" কিন্তু আমি জানি এরা খুব প্রফেশনাল। কারণ ওকে কেমন লাগছে সেই ছবি মনিটরে দেখেও স্টিলও দেখে নিতো। ঋতু যে সব নায়ক নায়িকা নিয়ে কাজ করেছে সে অমিতাভ বচ্চন, অজয় দেবগণ হোক কি প্রসেনজিৎ, দেবশ্রী সবার সাথে বন্ধুর মতো কাজ করতো। পোস্টে ঋতুর সঙ্গে ঐশ্বর্যের ছবিটি দেখেই আপনারা বুঝতে পারবেন ও কতটা আন্তরিক.... তবেই না ওই লেভেলের স্টারের সঙ্গে এমন বন্ধুর মত মেশা যায়। আর অন্য ছবিটি সেই ছবি যেটা আমি গল্ফ ক্লাবের পুকুরপাড়ে বসে তুলেছিলাম। ঋতুপর্ণ ঘোষ আমাকে অনেক ছবি তোলায় হেল্প করেছে। সত্যি আমি ভাগ্যবান যে ও আমাকে অনেক এক্সক্লুসিভ ছবি দিয়েছে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর বিয়ের ছবিও আনন্দলোকের জন্য আমাকে দিয়ে তুলেছে। সেখানেও ঋতুর কান্নার ছবি আনন্দবাজার নিউজে দিয়ে দিয়েছিলাম। সেও এক কাণ্ড। পরে একদিন লিখবো। খুব জোরের সাথে বলতে পারি বাংলায় সত্যজিৎ রায়ের পর এরকম ট্যালেন্টেড পরিচালক আমি কেনো আমরাও দেখিনি। ওর বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। যখন রিহার্স করতো বলতাম, " ঋতু আজ আমি তোমার বাড়ি যাবো।" ছবি তুলতে। সঙ্গে সঙ্গে বলতো, "দুপুরে খাবি তো?" ছবি তোলার ফাঁকে ও আমাকে অনেক অ্যাঙ্গেল বোঝাত। বেশিরভাগ সময় ওর ভাবনা ঠিক হলেও অনেক সময় আমার ভাবনাকেও ঋতু গুরুত্ব দিতো। একজন ভাল পরিচালকের এরকম ভূমিকাই যথেষ্ট। ঋতুপর্ণ হঠাৎ চলে যায়। বেঁচে থাকলে ভারতবর্ষ কেন পৃথিবীর চলচ্চিত্রেও ওর আরও অনেক অসাধারণ কাজ আমরা দেখতে পারতাম। বলিউডের এক নম্বর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ওর সিনেমায় কাজের জন্য মুখিয়ে থাকতো। এটা আমাদের ( বাংলার ) কাছে সত্যিই গর্বের। ঋতুপর্ণ সবাইকেই "তুই" বলে সম্বোধন করতেন। আপনারা অনেকেই জানেন না একমাত্র বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঋতুপর্ণ তুমি বলতেন। এটা আমার কাছে খুব মজার লাগতো। একদিন তো ঋতুর সামনেই দিদিকে বলেছিলাম, "দিদি ঋতুপর্ণ কিন্তু সবাইকে তুই বলে।" দিদি হেসে বলেছিলেন, "ঋতু তুমি আমাকেও তুই বলতে পারো।" ঋতু তখন মুখে হাত দিয়ে হেসে হেসেই চেয়ারে উল্টে পরার মত...."এটা তুমি কি বলছো ? ইসস এটা কি বলা যায়....!!" ঋতু, এখনও তোমার ছবি বই দেখি পরি। আর তোমায় মিস করি। শুধু আমি কেন, তোমায় মিস করে সবাই। তোমার গভীর ভাবনা, তোমার পড়াশোনা, তোমার আন্তরিক ব্যবহার সব মিলিয়ে মিশিয়ে একজন সুন্দর মনের মানুষ ছিলে তুমি। বড্ড অসময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলে!! এই দুঃখ কোনোদিনই বাঙালি ভুলবে না। আজকাল এই ছবিওয়ালা তার জার্নির ভিতরে খুঁজে বেড়ায় সেই ফেলে আসা সময়ের টুকরোগুলো যা সে ছড়িয়েছে জীবনের পথে চলতে চলতে। এখন কুড়োতে গিয়ে মনে হচ্ছে, একে একে নিভিছে দেওটির মত করে কতজন মায়া কাটিয়ে চলে গেছে কালের অতলে। বিবর্তন হয়েছে সময়ের। শুধু অতীতের হলুদ পাতার মত বৃদ্ধ ছবিওয়ালার কাছে থেকে গেছে কটা মুহূর্ত। ঋতু, তুমি যেখানেই থেকো ভালো থেকো একথা একদমই বলবো না। কারণ আমি মনে করি, মানুষের ভালো থাকা মন্দ থাকা সবটাই তার জীবিতকালের মধ্যেই ঘটে। তারপর আর কিছু নেই। তখন একথা অর্থহীন। শুধু মন বোঝানো। তোমাকে যতটুকু চিনেছি, জেনেছি তা আমার কাছে অত্যন্ত দামী। সেই জায়গা থেকেই তুমি আমার অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিও। তোমার ফেলে যাওয়া স্মৃতি আর ছবি আমি সারাজীবন স্মরণে রাখবো।। ধন্যবাদ।। অশোক মজুমদার ২৩.০৪.২০২২ শুভ জন্মদিন ঋতুপর্ণ ঘোষ ❤️